চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ের হুকুম । মাওলানা আরিফ আব্দুল্লাহ

  

প্রসঙ্গ : চেয়ারে বসে নামাজ আদায়ের হুকুম।

প্রশ্ন: চেয়ারে বসে ফরজ নামায পড়া যাবে কী? পড়া গেলে কখন পড়া যাবে এবং কখন পড়া যাবে না?


উত্তর: 

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله، وسلام على عباده الذين اصطفى، وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لاشريك له، وأشهد أن محمدا عبده ورسوله، أما بعد


নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত; যা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না। যা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ। এমনকি যদি কেউ অসুস্থতার কারণে দাঁড়াতে সক্ষম না হয় তাহলে বসে রুকু—সিজদা করবে। বসে রুকু—সিজদা করতে সক্ষম না হলে বসে ইশারায় এবং বসতে সক্ষম না হলে শুয়ে ইশারায় নামায আদায় করতে হবে। উল্লিখিত বর্ণনা দ্বারা সহজেই বুঝা যাচ্ছে, নামায ও নামাযের প্রত্যেকটা কাজ কতটা গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেক নামাযীর জন্য আবশ্যক হল, একাগ্রতার সাথে সমস্ত ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব আদায়ের মাধ্যমে নামায সম্পন্ন করা।

নামাযের রোকনসমূহের অন্যতম হল, দাঁড়িয়ে নামায় পড়া ও রুকু—সিজদা করা। যদি কেউ দাঁড়াতে সক্ষম না হয়, শরিয়ত তাকে বসে নামাজ পড়ার, এমনিভাবে রুকু সিজদায় সক্ষম না হলে ইশারায় নামায আদায়ের সুযোগ দিয়েছে। বসে নামায আদায়ের ক্ষেত্রে বসার কোনো পদ্ধতিকে নির্দিষ্ট করা হয়নি। তাই বসার যত পদ্ধতি হতে পারে সব পদ্ধতিতেই নামায আদায়ের অবকাশ রয়েছে। তবে সবচেয়ে উত্তম হল, আত্তাহিয়্যাতুর সুরতে বসে নামায আদায় করা। বসে রুকু সিজদা করতে সক্ষম হলে রুকু সিজদা করবে। অন্যথায় ইশারায় নামায আদায় করবে। বসার পদ্ধতি—সমূহ থেকে একটা হল, চেয়ারে বসে নামায আদায় করা। যা সবচেয়ে আরামদায়ক ও নামাযের বাইরের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। চেয়ারে বসে নামাযের ক্ষেত্রে অধিকাংশ লোকই ইশারায় নামায আদায় করে থাকে। বসে নামাযের এ পদ্ধতিটি অন্যান্য পদ্ধতি থেকে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় এক্ষেত্রে কতিপয় লক্ষণীয় বিষয় রয়েছে, যা নিম্নে বর্ণনা করা হলো:

 যারা মাটি বা ফ্লোরে বসে নামায আদায় করলে রুকু সিজদা করতে পারেন, কিন্তু চেয়ারে বসে রুকু—সিজদা করতে পারেন না, তাদের জন্য চেয়ারে নামায পড়া জায়েয নেই। এতে নামায সহিহ হবে না। হ্যাঁ, রুকু সিজদার সময় চেয়ার থেকে নেমে রুকু সিজদা করলে নামায হয়ে যাবে। 

সূত্র: ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৩৬; খুলাসাতুল ফাতাওয়া: ১/১৯৪


 যারা মাটি বা ফ্লোরে বসে নামায পড়তে সক্ষম তাদের জন্য চেয়ারে বসে নামায পড়া উচিত নয়। অনেকেই এ ব্যাপারে ফুকাহায়ে কেরামের একমত হওয়ার দাবি করেছেন যে, বসে নামায আদায়কারী যেভাবেই বসে নামায আদায় করুক আত্তাহিয়্যাতুর সময় আত্তাহিয়্যাতুর সুরতেই বসতে হবে। কিন্তু আল্লামা শামী রহ. বলেন আত্তাহিয়্যাতুর সুরতে বসতে সক্ষম হলে নামাযের সর্বহালতেই আত্তাহিয়্যাতুর সুরতেই বসা উত্তম। সক্ষম না হলে সর্বহালতেই যে কোন পদ্ধতিতে বসে নামায আদায় করা যেতে পারে।

সূত্র: আদ—দুররুল মুখতার: ২/৫৬৬; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া: ২/৬৬৭% ফাতাওয়া কাসেমিয়া: ৯/৪৬।


হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ কিতাব আলমুহীতুল বুরহানীতে আছেÑ

وقال عليه السلام لعمران بن حصين رضي الله عنه حين عاده وهو مريض: صل قائماً فإن لم تستطع فقاعداً، فإن لم تستطع فعلى الجنب تومىء إيماءً والمعنى في ذلك أن الطاعة بحسب الطاقة. وقوله: فإن عجز عن القيام وقدر على القعود يصلي المكتوبة قاعداً، لم يرد بهذا العجز العجز أصلاً لا محالة بحيث لا يمكنه القيام بأن يصير مقعداً، بل إذا عجز عنه أصلاً، أو قدر عليه إلا أنه يضعفه ذلك ضعفاً شديداً حتى تزيد علته لذلك، أو يجد وجعاً بذلك، أو يخاف إبطاء البرء، فهذا وما لو عجز عنه أصلاً سواء.

অর্থাৎ অক্ষমতার প্রথম অর্থ হল, কাজটির সামর্থ্যই না থাকা। আর যদি সামর্থ্য থাকে, কিন্তু এটি করলে সে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে বা এর কারণে তার রোগ বেড়ে যায় কিংবা এর কারণে তীব্র ব্যথা অনুভব করে অথবা এমনটি করলে তার রোগ নিরাময় হতে বিলম্ব হবেÑ এ অবস্থাগুলোই কেবল অক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। (আলমুহীতুল বুরহানী ৩/২৬)


 বর্তমান যুগ বিবেচনায় যারা নামাযের বাইরে মাটি বা ফ্লোরে বসে খাওয়া—দাওয়া, গল্পগুজব করতে পারেন তাদের জন্য চেয়ারে বসে নামায পড়া খুবই নিন্দনীয়। এতে নামাযের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন হয়। অনেকেই চেয়ারের সামনে টেবিল ইত্যাদি রেখে সিজদা করে থাকেন, এতে সিজদা আদায় হবে না, বরং ইশারা বলে গণ্য হবে। যারা রুকু সিজদা করতে সক্ষম তারা এভাবে নামায পড়লে তাদের নামায সহি হবে না। 

সূত্র: আদ—দুররুল মুখতার: ২/৫৬৮; কানযুদ—দাকায়েক: ৩৯; নামাযকে মাসাইলকা ইনসাইক্লোপেডিয়া: ৩/৩১৫—৩১৬। 

 যদি কোন ব্যক্তি বাড়িতে নামায আদায় করেন, বেশি জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে রুকু সিজদার সাথে নামায আদায় করতে পারেন, কিন্তু মসজিদে নামায পড়তে গেলে জায়গা স্বল্পতা বা কাতারের শৃংখলার কারণে দাঁড়িয়ে বা চেয়ারে বসে রুকু সিজদার সাথে নামায আদায় করতে পারেন না এমন ব্যাক্তিরা বাড়িতেই নামায আদায় করবেন।

সূত্র: আল—আশবাহ ওয়ান—নাযায়ের: ১/২৬২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৩৬; নামাযকে মাসাইলকা ইনসাইক্লোপেডিয়া: ৩/৩১৭—৩১৮।

 যারা দাঁড়াতে সক্ষম কিন্তু রুকু সিজদায় সক্ষম নন বা দাঁড়াতে ও রুকু করতে সক্ষম কিন্তু সিজদা করতে সক্ষম নন, তাদের জন্য বসে ইশারায় বা দাঁড়িয়ে ইশারায় নামায পড়া উভয়টি জায়েয। তবে উত্তম হল, বসে ইশারায় নামায পড়া। কেননা বসাটি সিজদার অধিক নিকটবর্তী। অবশ্য অনেক সমসাময়িক অভিজ্ঞ মুফতিয়ানে কেরাম দাঁড়াতে সক্ষম হলে দাঁড়িয়ে ইশারায় নামায পড়াকেই উত্তম বলেছেন। কেননা দাঁড়িয়ে নামায পড়া নামাযের একটি পৃথক ফরজ, যা যথাসম্ভব ছেড়ে দেয়া ঠিক নয়। 

সূত্র: আদ—দুররুল মুখতার: ২/৫৬৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৩৬

 চেয়ারে বসে জামাতের সাথে নামায আদায় করলে, কাতারে চেয়ার রাখার নিয়ম হল: চেয়ারের পেছনের পায়া দুটি কাতার বরাবর রাখবে, যেখানে অন্যান্য মুসল্লিরা পা রাখেন।

সূত্রঃ ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ১/১৩৬; হিদায়া ১/১৬২; নামাযকে মাসাইলকা ইনসাইক্লোপেডিয়া: ৩/৩১৮—৩১৯।

সারর্মম এই যে, যে ব্যক্তি দাঁড়িয়ে নামায আদায় করতে অক্ষম তার জন্য বিকল্প পদ্ধতি হল, যমিনে বসে তা আদায় করা। আর যে রুকু—সিজদা করতে অক্ষম তার জন্য বিকল্প পন্থা হল, ইশারায় রুকু—সিজদা আদায় করা। আর যে ব্যক্তি যমিনে বসতে অক্ষম তার জন্য যমিনে বসে আদায়ের বিকল্প যদি চেয়ার হয় তাহলে উপরোল্লিখিত অনুযায়ী আদায় জায়েজ হবে। অন্যথায় জায়েজ হবে না।

والله اعلم بالصواب